মো:আল-আমিন
একসময় এই ভূখণ্ড পরিচিত ছিল মায়া, মমতা ও অটুট পারিবারিক বন্ধনের দেশ হিসেবে। শিশুর অমলিন হাসি, প্রতিবেশীর প্রতি গভীর আস্থা আর মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতাই ছিল এ সমাজের আসল সৌন্দর্য।
কিন্তু আজ আমরা এমন এক দুঃসময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে একটি নিষ্পাপ শিশুর আর্তনাদ পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিলেও সমাজের গভীরে জমে থাকা অমানবিকতার অন্ধকার কাটছে না। প্রশ্ন জাগে—আমাদের সন্তানেরা আসলে কেমন বাংলাদেশে বড় হচ্ছে? তারা কি নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাবে, নাকি সহিংসতা ও বিকৃত মানসিকতার এক ভয়াবহ রাষ্ট্রে বেড়ে উঠবে?

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু লামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, গোটা জাতিকে স্তব্ধ ও আতঙ্কিত করেছে। একটি শিশুকে হত্যার পর মরদেহ গুম করতে মাথা বিচ্ছিন্ন করা এবং শরীরের অংশ টুকরো করার চেষ্টা—এমন ভয়াবহতা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীদের মনে আইনের ভয় ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বর্বরতায় মূল ঘাতকের স্ত্রীকে সহায়তাকারী হিসেবে পাওয়া গেছে। এমন সামাজিক অধঃপতন আমাদের স্তম্ভিত করে।
কেন এই বিপর্যয়?
এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধানত কয়েকটি ভয়াবহ বাস্তবতা কাজ করছে:
বিচারহীনতার সংস্কৃতি: ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের নতুন অপরাধের লাইসেন্স জোগায়।
নৈতিক শিক্ষার সংকট: আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে আমরা তথ্যে আধুনিক হয়েছি, কিন্তু মানবিকতায় পিছিয়ে গেছি। পারিবারিক ও শিক্ষাঙ্গনে নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং অনলাইন জগতের সহিংস বিনোদন তরুণ প্রজন্মের একাংশকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা: মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। তদন্তে গাফিলতি এবং বিচারিক ধীরগতির ফলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। যে রাষ্ট্র তার শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ, তার উন্নয়ন কেবলই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
সামাজিক নীরবতা: আমরা ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকদিন ক্ষোভ প্রকাশ করি, তারপরই বিস্মৃত হই। কিন্তু অপরাধীরা থেমে থাকে না। সমাজের এই নীরবতাও পরোক্ষভাবে অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
এখনই সময়—প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার
শুধু আবেগ দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে কাঠামোগত পরিবর্তন:
১. ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল: শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
২. প্রভাবমুক্ত তদন্ত: অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতা যেন তদন্ত বা বিচারে বাধা হতে না পারে।
৩. নৈতিকতার পুনর্জাগরণ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং পরিবারে সন্তানদের মানসিক নিরাপত্তার বলয় তৈরি করতে হবে।
৪. অনলাইন মনিটরিং: বিকৃত ও সহিংস কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা কেবল পরিবারের সন্তান নয়; তারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ও জাতির স্বপ্ন। আজ যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা প্রশ্ন তুলবে—“তোমরা কেমন দেশ রেখে গিয়েছিলে, যেখানে শিশুরাও নিরাপদ ছিল না?”

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রতিটি শিশু নির্ভয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবে। যেখানে অপরাধীর পরিচয়ের চেয়ে ন্যায়বিচারই হবে বড় শক্তি। আসুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার হই; কারণ একটি শিশুর কান্না পুরো জাতির বিবেকের আর্তনাদ।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের সকল বিপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
মো: আল-আমিন,নির্বাহী সম্পাদক,দৈনিক ভোরের হাওয়া
Www.bhorerhaoa.com
Leave a Reply